৬ জুন, নিজস্ব প্রতিনিধি।
নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার একটি অসহায় পরিবার। একই পরিবারের দুই প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে বাবা-মায়ের জীবন যেন এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। সীমিত আয়, চিকিৎসার ব্যয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝেও পরিবারটির হার মানেননি। তবে আর্থিক সক্ষমতার অভাবে তাদের উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছেনা মা-বাবা। পরিবারটি দুই সন্তানের সরকারি সহযোগীতা ও সমাজের বিত্তবানদের নিকট সহায়তা কামনা করছেন। ঘটনাটি কুলিয়ারচর উপজেলার আগরপুর মধ্যপাড়া গ্রামে। এই গ্রামের মোবারক মিয়া ও নিমা আক্তারের দুই সন্তান মোশারফ (১৫) ও রিফাত (১০) প্রতিবন্ধি বেঁচে থেকে জীবনযাপন করছে। এই দুই সন্তান নিয়ে পরিবারটি বিপাকে আছে।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের কুলিয়াররে রামদী ইউনিয়নের মধ্য আগরপুর প্রামে বসবাস করেন কৃষক ও শ্রমিক মোবারক মিয়া ও তাঁর স্ত্রী নিমা আক্তার। তাদের পাঁচ সন্তান। এর মধ্যে চার ছেলে ও এক মেয়ে। তাঁদের সংসারে বড় দুই সন্তান ১৫ বছরের মোশারফ এবং ১০ বছরের রিফাত। জন্মের পর থেকেই দুজনই শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে লড়াই করছে। একই পরিবারের দুই শিশুর এমন বাস্তবতা তাদের বাবা-মায়ের জীবনে যেমন কষ্টের কারণ, তেমনি সন্তানদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসারও এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
মোশারফ সর্ম্পূণভাবে একজন প্রতিবন্ধী।সে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। খাওয়া-দাওয়া গোসলসহ প্রাত্যহিক সকল কাজ মা,বাবা ও দাদীকেই করতে হয়। অন্যদিকে রিফাত মানুষিক প্রতিবন্ধী। শ্রবণ ক্ষমতা খুবই সীমিত। সে কথা বলতে পারে না, কিন্তু হাসি দিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে। শিশুদের সঙ্গে মিশতে গেলেই তাদের মারধর করে, বিরক্ত করে প্রতিবেশীরা । সে নিজের বাড়ি ছাড়াও প্রতিবেশীদের বাড়িতে ঢুকে জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে মা–বাবা তাকে শিকল দিয়ে বেধে রাখতে হয়।
পরিবারটির আয়ের উৎস বলতে এক বিঘা জমি। ফলে সংসারের খরচ জোগাতে দিন মুজুরের কাজও করে বাবা ।পরিবারটির আয় অল্প- স্বল্প। যেখানে সংসারের নিত্যপ্রয়োাজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয় তাদের । তার ওপর দুই সন্তানের চিকিৎসা ও বিশেষ যত্ন এবং ব্যয় বহন করা মা বাবার জন্য খুবই কঠিন কাজ।
বাবা মোবারক মিয়া বলেন, ‘বড় ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘরে পড়ে আছে। অন্যের সাহায্য ছাড়া নিজে চলাফেরা করতে পারে না। তাকে নিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। দ্বিতীয় ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় আমাদের জীবনটা আরও কঠিন হয়ে গেছে। এখন তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। দুই প্রতিবন্ধি অসুস্থ সন্তানকে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারছিনা । কিশোরগঞ্জ জেলাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসক ও কবিরাজ দেখিয়েছেন তারা । কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা বেশি দূর এগোয়নি।নিজের “সন্তানদের জন্য মন কাঁদে, চিকিৎসা করাতে চাই, কিন্তু আমাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই। তারপরও যতটুকু পারি চেষ্টা করি।”
মা নিমা আক্তার ও দাদী মুরতুজা বেগম দিনের বেশিরভাগ সময় সন্তানদের দেখাশোনায় ব্যস্ত থাকেন। মা বলেন, “অনেক সময় নিজের কষ্টের কথা ভুলে যাই। শুধু চাই, আমার সন্তানরা একটু ভালো থাকুক। তারা সরকারের আর্থিক সহযোগীতা কামনা করেন। এছাড়া সমাজের বিত্তবানদের সহায়তা চান তারা।
দাদী মুরতুজা বেগম বলেন আমার নাতি যখন প্রথম জন্ম হয় তখন খুশীতে আত্মহারা ছিলাম। ভেবেছিলাম ফুটফুটে সন্তান হবে কিন্ত প্রতিবন্ধি শিশু জন্ম হলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। তারপর দ্বিতীয় নাতি জন্মের আগে আবারও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম সুস্থ শিশু যেন জন্ম হয় কিন্ত আবারও জন্ম হলো সেই প্রতিবন্ধি শিশু। এখন দুই নাতি নিয়ে কষ্টে আছি।
স্থানীয় বাসিন্দা লিমন মিয়া বলেন, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝে সহযোগিতা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। তারা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা কামনা করেছেন।
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ইয়াসিন খন্দকার বলেন, আমার জানামতে প্রতিবন্ধি মোশারফ ও রিফাত দুইজনই সরকার থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে। এটি তাদের জন্য অপ্রতুল। তিনি স্থানীয় সাংসদ ও প্রতিমন্ত্রীর সাথে বিষয়টি আলোচনা করে বিশেষ ব্যবস্থা প্রহনের আশ্বস দেন।
দুই প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে এই পরিবারের জীবন সংগ্রাম শুধু একটি পরিবারের গল্প নয় এটি সমাজের কাছে মানবিক দায়বদ্ধতারও একটি বড় প্রশ্ন। সরকার ও সমাজের যথাযথ সহায়তা ও সহযোগিতা পেলে মোশারফ ও রিফাতের মতো শিশুরাও সমাজের মূলধারায় যুক্ত হতে পারতো। কিন্ত সেই প্রত্যাশা পরিবারটিতে নেই। এখন মানবতার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
Reporter Name 









