ভৈরবে বাজারের নাম নিয়ে দুইগ্রামবাসীর সংঘর্ষ। নেপথ্যে রয়েছে আধিপত্য ও চাঁদাবাজি।

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৩৭:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
  • ৫৩ Time View

২৮ জুলাই, নিজস্ব প্রতিনিধি:

ভৈরবে বাজারের নাম নিয়ে দুইগ্রামবাসীর সংঘর্ষে গতকাল সোমবার দুইজন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছে। এর তিনবছর আগে এমনভাবে আরও একাধিকবার ঝগড়া সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এলাকার আধিপত্য ও বাজারের ইজারা,  চাঁদাবাজি। ভৈরব উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগুলিতে আধিপত্য প্রভাব নিয়ে প্রায় সময় ঝগড়া সংঘর্ষ হয়ে থাকে। এসব আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষে  অসংখ্য লোক আহত ও একাধিক লোক খুন হয়। সোমবারের ঘটনাটি তার কোন ব্যতিক্রম নয়। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর বাজারটি ১৯৯১ সালে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামবাসী মিলে বাজারটি প্রতিষ্ঠার সময় নামকরণ করা হয়েছিল আকবরনগর – মিরারচর বাজার। পরবর্তীতে  আকবরনগরবাসী আধিপত্য  বিস্তার করে মিরারচর নামটি বাদ দিয়ে  শুধু আকবরনগর বাজার রাখা হয়। তারা যুক্তি দেখায় বাজারটির স্থান হলো আকবরনগর মৌজা। এই নাম পরিবর্তনের কারনে মিরারচরগ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়। শুরু হয় দুই গ্রামের দ্বন্দ ঝগড়া সংঘর্ষ। নাম পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটে কয়েক বছর আগে। 

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই বাজারটি প্রতি বছর ইজারা দেয়া হয়। এছাড়া দুই গ্রামের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বাজারে দোকান বসিয়ে চাঁদা আদায় করে। ইজারাদারি যে পাই তিনি প্রভাবশালী কিছু লোক নিয়ে অতিরিক্ত টোল আদায় করে। আবার সরকারী রাস্তা বা খালি জায়গায় দোকান বসিয়ে প্রতিমাসে হাজার হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে প্রভাবশালীরা। মাসে লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয় বলে একটি সূত্র দাবি করে।  সূত্রটি আরও  জানায় দুটি গ্রামের মধ্য আকবরনগর গ্রামটি সু্বিধাজনক অবস্থানে থাকায় তারা প্রভাব দেখায় বেশী এবং চাঁদার ভাগ বেশী নিতে চাই। অপরদিকে পার্শ্ববর্তী গ্রাম হলো মিরারচর। এই গ্রামের প্রভাবশালীরা আকবরনগর গ্রামের লোকজনের মাতাব্বরি, চাঁদার ভাগ বেশী নেয়া মানতে রাজী নয়। সাধারণ লোকজন এসবের খবর রাখেনা। তারা উভয় গ্রামের প্রভাবশালীরা যারা চাঁদাবাজি ইজারা ডাকে তারা গ্রামবাসীকে ভুল তথ্য দিয়ে বাজারের নাম নিয়ে দ্বন্দের কথা প্রচার করে  ঝগড়া সংঘর্ষে লিপ্ত হয় বার বার। ঘটনার নেপথ্যে এসব তথ্য  বেরিয়ে আসে। 

কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মুজিবুর রহমান  বলেন, বাজারের নাম নিয়ে দ্বন্দ মীমাংসা করতে আমরা বার বার চেষ্টা করেছি কিন্ত পারেনি থামাতে। গত রবিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পাট, বস্ত্র প্রতি  মন্ত্রী শরীফুল আলম  এলাকায় এসে দুই পক্ষকে ডেকে বলেছিল ঝগড়া সংঘর্ষ না করতে। তিনি বলেছিলেন উভয় পক্ষ থেকে ১০ জন করে নিয়ে আলোচনায় বসে বিষয়টি মীমাংসা করে দিবেন। কিন্ত পরদিন সোমবারই সংঘর্ষ বেঁধে গেল। এতে নিহত হয় ২ জন, আহত ৫০ জন। কে শুনে কার কথা। প্রতিমন্ত্রীর কথা কোন পক্ষই রাখেনি।  তিনি বলেন বাজারের আধিপত্য, ইজারা, চাঁদাবাজি নিয়েই দুই পক্ষের বিরোধ। আকবর নগর গ্রামের হেলু মিয়া, তার ছেলে লোকমান, রাজীব এবং অপরদিকে মিরারচর গ্রামের বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক বরজু মিয়া, লিটন বিরোধের নায়ক। এছাড়া বাজার কমিটির সভাপতি আলকাছ মিয়াও ঘটনায় জড়িত আছে তার দাবি। 

একই ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি মোঃ জামাল একই কথা বলেন। তিনি বলেন, বাজারের নাম থাকবে আকবরনগর – মিরারচর। নামের বিষয়টি মীমাংসিত। এখন আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি নিয়ে আকবরনগরবাসী মৌজার নামের কথা বলে মিরারচর নামটি বাদ দিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। এতে মিরারচরবাসী ক্ষুব্ধ হয়। ফলে আবারও সোমবারের ঘটনাটি ঘটল। খুন হলো দুইজন। এখন মামলায় আসামী যারা হবে তাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে। আমরা ঘটনার মীমাংসা করতে পারছিনা। আজ মঙ্গলবার বিকেলে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। 

কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ লিটন মিয়া জানান, বাজার এলাকাটি আমার ইউনিয়নে পড়েছে। বাজারের নামের বিষয়টি নিয়ে আমি অনেকবার দুই গ্রামবাসীর সাথে বসেছি। কিন্ত তারা কেউ কাউকে মানতে রাজী নয়। আমি চেষ্টা করেও দুই পক্ষকে বিরত রাখতে পারছিনা। 

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জ ( ওসি)  লিমন বোস জানান, বাজারের নাম নিয়ে দুটি গ্রামের বিরোধ। এমন ঘটনা আমি দেখেনি। এবিষয়টি নিয়ে সোমবার সংঘর্ষে দুইজন নিহত হলো। অর্ধশত আহত হয়। ঘটনাটি থামাতে ৬ ঘন্টা সময় লাগে। সংঘর্ষের সময় উছৃংখল জনতা রেলপথ, সড়কপথ ৬ ঘন্টা অবরোধ করে রাখে। দুটি গ্রামের মানুষ দা, বল্লম, লাঠি, ইটপাটকেল নিয়ে মাঠে নামে। পুলিশ পর্যন্ত সংঘর্ষ থামাতে পারছিলনা। আজ মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা আছে। নিহতের ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কোন পক্ষ মামলা দিতে আসেনি। 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

দেশে জুলাই আন্দোলন না হলে স্বৈরাচার বিদায় হতনা। 

ভৈরবে বাজারের নাম নিয়ে দুইগ্রামবাসীর সংঘর্ষ। নেপথ্যে রয়েছে আধিপত্য ও চাঁদাবাজি।

Update Time : ০১:৩৭:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

২৮ জুলাই, নিজস্ব প্রতিনিধি:

ভৈরবে বাজারের নাম নিয়ে দুইগ্রামবাসীর সংঘর্ষে গতকাল সোমবার দুইজন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছে। এর তিনবছর আগে এমনভাবে আরও একাধিকবার ঝগড়া সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এলাকার আধিপত্য ও বাজারের ইজারা,  চাঁদাবাজি। ভৈরব উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগুলিতে আধিপত্য প্রভাব নিয়ে প্রায় সময় ঝগড়া সংঘর্ষ হয়ে থাকে। এসব আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষে  অসংখ্য লোক আহত ও একাধিক লোক খুন হয়। সোমবারের ঘটনাটি তার কোন ব্যতিক্রম নয়। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর বাজারটি ১৯৯১ সালে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামবাসী মিলে বাজারটি প্রতিষ্ঠার সময় নামকরণ করা হয়েছিল আকবরনগর – মিরারচর বাজার। পরবর্তীতে  আকবরনগরবাসী আধিপত্য  বিস্তার করে মিরারচর নামটি বাদ দিয়ে  শুধু আকবরনগর বাজার রাখা হয়। তারা যুক্তি দেখায় বাজারটির স্থান হলো আকবরনগর মৌজা। এই নাম পরিবর্তনের কারনে মিরারচরগ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়। শুরু হয় দুই গ্রামের দ্বন্দ ঝগড়া সংঘর্ষ। নাম পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটে কয়েক বছর আগে। 

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই বাজারটি প্রতি বছর ইজারা দেয়া হয়। এছাড়া দুই গ্রামের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বাজারে দোকান বসিয়ে চাঁদা আদায় করে। ইজারাদারি যে পাই তিনি প্রভাবশালী কিছু লোক নিয়ে অতিরিক্ত টোল আদায় করে। আবার সরকারী রাস্তা বা খালি জায়গায় দোকান বসিয়ে প্রতিমাসে হাজার হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে প্রভাবশালীরা। মাসে লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয় বলে একটি সূত্র দাবি করে।  সূত্রটি আরও  জানায় দুটি গ্রামের মধ্য আকবরনগর গ্রামটি সু্বিধাজনক অবস্থানে থাকায় তারা প্রভাব দেখায় বেশী এবং চাঁদার ভাগ বেশী নিতে চাই। অপরদিকে পার্শ্ববর্তী গ্রাম হলো মিরারচর। এই গ্রামের প্রভাবশালীরা আকবরনগর গ্রামের লোকজনের মাতাব্বরি, চাঁদার ভাগ বেশী নেয়া মানতে রাজী নয়। সাধারণ লোকজন এসবের খবর রাখেনা। তারা উভয় গ্রামের প্রভাবশালীরা যারা চাঁদাবাজি ইজারা ডাকে তারা গ্রামবাসীকে ভুল তথ্য দিয়ে বাজারের নাম নিয়ে দ্বন্দের কথা প্রচার করে  ঝগড়া সংঘর্ষে লিপ্ত হয় বার বার। ঘটনার নেপথ্যে এসব তথ্য  বেরিয়ে আসে। 

কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মুজিবুর রহমান  বলেন, বাজারের নাম নিয়ে দ্বন্দ মীমাংসা করতে আমরা বার বার চেষ্টা করেছি কিন্ত পারেনি থামাতে। গত রবিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পাট, বস্ত্র প্রতি  মন্ত্রী শরীফুল আলম  এলাকায় এসে দুই পক্ষকে ডেকে বলেছিল ঝগড়া সংঘর্ষ না করতে। তিনি বলেছিলেন উভয় পক্ষ থেকে ১০ জন করে নিয়ে আলোচনায় বসে বিষয়টি মীমাংসা করে দিবেন। কিন্ত পরদিন সোমবারই সংঘর্ষ বেঁধে গেল। এতে নিহত হয় ২ জন, আহত ৫০ জন। কে শুনে কার কথা। প্রতিমন্ত্রীর কথা কোন পক্ষই রাখেনি।  তিনি বলেন বাজারের আধিপত্য, ইজারা, চাঁদাবাজি নিয়েই দুই পক্ষের বিরোধ। আকবর নগর গ্রামের হেলু মিয়া, তার ছেলে লোকমান, রাজীব এবং অপরদিকে মিরারচর গ্রামের বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক বরজু মিয়া, লিটন বিরোধের নায়ক। এছাড়া বাজার কমিটির সভাপতি আলকাছ মিয়াও ঘটনায় জড়িত আছে তার দাবি। 

একই ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি মোঃ জামাল একই কথা বলেন। তিনি বলেন, বাজারের নাম থাকবে আকবরনগর – মিরারচর। নামের বিষয়টি মীমাংসিত। এখন আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি নিয়ে আকবরনগরবাসী মৌজার নামের কথা বলে মিরারচর নামটি বাদ দিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। এতে মিরারচরবাসী ক্ষুব্ধ হয়। ফলে আবারও সোমবারের ঘটনাটি ঘটল। খুন হলো দুইজন। এখন মামলায় আসামী যারা হবে তাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে। আমরা ঘটনার মীমাংসা করতে পারছিনা। আজ মঙ্গলবার বিকেলে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। 

কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ লিটন মিয়া জানান, বাজার এলাকাটি আমার ইউনিয়নে পড়েছে। বাজারের নামের বিষয়টি নিয়ে আমি অনেকবার দুই গ্রামবাসীর সাথে বসেছি। কিন্ত তারা কেউ কাউকে মানতে রাজী নয়। আমি চেষ্টা করেও দুই পক্ষকে বিরত রাখতে পারছিনা। 

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জ ( ওসি)  লিমন বোস জানান, বাজারের নাম নিয়ে দুটি গ্রামের বিরোধ। এমন ঘটনা আমি দেখেনি। এবিষয়টি নিয়ে সোমবার সংঘর্ষে দুইজন নিহত হলো। অর্ধশত আহত হয়। ঘটনাটি থামাতে ৬ ঘন্টা সময় লাগে। সংঘর্ষের সময় উছৃংখল জনতা রেলপথ, সড়কপথ ৬ ঘন্টা অবরোধ করে রাখে। দুটি গ্রামের মানুষ দা, বল্লম, লাঠি, ইটপাটকেল নিয়ে মাঠে নামে। পুলিশ পর্যন্ত সংঘর্ষ থামাতে পারছিলনা। আজ মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা আছে। নিহতের ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কোন পক্ষ মামলা দিতে আসেনি।