ভৈরবে ট্রমা হাসপাতালের  চিকিৎসকের অবহেলায় প্রসূতি নারীর মৃত্যুর অভিযোগ।। নিহতের পরিবারের সাথে  চার  লাখ টাকায় আপোষ।। 

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:২০:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৭০২ Time View

 ৩ জানুয়ারী,  নিজস্ব  প্রতিনিধি। 

 ভৈরবে  বেসরকারি ট্রমা  হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ঝুমা বেগম (২০) নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত ঝুমা বেগম ভৈরব উপজেলার কালিপুর দক্ষিণ পাড়ার কুদ্দুস মিয়ার মেয়ে এবং কালিকাপ্রসাদ এলাকার মো. তৌফিক মিয়ার স্ত্রী। মাত্র দেড় বছর আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এই দম্পতির এটিই ছিল প্রথম সন্তান।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেলে প্রসব বেদনা শুরু হলে ঝুমাকে স্থানীয় ভৈরব ট্রমা এন্ড জেনারেল হাসপাতাল (প্রা:) ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর রোগীকে কোনো প্রকার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রাত ৮টার দিকে তড়িঘড়ি করে অস্ত্রোপচার (সিজার) করেন ডা. হরিপদ দেবনাথ। ঝুমা একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেও অস্ত্রোপচারের কিছুক্ষণ পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।

নিহতের স্বজনরা জানান, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের ভুলে রোগীর জরায়ু কেটে ফেলায় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রাতভর ৮ ব্যাগ রক্ত দিলেও রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সকালে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে  পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ শনিবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়। 

নিহতের চাচা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা ও চরম অবহেলার কারণেই আমার ভাতিজির মৃত্যু হয়েছে। অবস্থা খারাপ হওয়ার পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শেষ মুহূর্তে ঢাকায় রের্ফাড করেন। তখন আর করার কিছু ছিল না।

নিহতের চাচাতো ভাই রাকিব জানান, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটি একটি অবহেলা। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিলে আজকে এই মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটতো না। ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ঝুমার  মৃত্যু হয়েছে।

এই দিকে নিহতের স্বজনরা ঢাকা থেকে মরদেহটি নিয়ে বিকাল ৫টায় ভৈরব থানার সামনে উপস্থিত হন। এসময় ২ ঘন্টার বেশি সময় থানার গেইটে সামনে মরদেহটির এম্বোলেন্স দাড়াঁনো থাকে। এক পর্যায়ে থানার গেটে মরদেহ রেখে হাসপাতাল মালিকদের পক্ষে একটি  প্রভাবশালী মহলের মধ্যস্থতায় বিষয়টি ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নিহতের স্বজনদের মধ্যে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রফাদফা হয়। বিষয়টির ব্যাপারে নিহত ঝুমার চাচা রাশেদ জনপদ প্রতিনিধির নিকট স্বীকার করেন ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি আপোষ মীমাংসা হয়েছে ।  যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ  রফাদফার কথা অস্বীকার করেছে। 

এব্যাপারে অ্যানেস্থেসিয়া ডাক্তার মাহবুবুর রহমান রাজীব জানান, রোগীর অপারশনের সময় ভাল ছিল। পরে আমি চলে আসার পর কি হয়েছে তা আমি জানিনা। 

এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. হরিপদ দেবনাথ বলেন, অপারেশন করার পর রোগীর অবস্থা ভাল ছিল। কিন্ত পরবর্তীতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ( ডিআইসি)  শুরু হলে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়। সাধারনত প্রসুতির অপারেশনে এমন হয়না। তবে তার অপারেশনের প্রেসার উঠানামা করেছে। পরে তাকে আমরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠিয়ে দেয়। সেখানে আজ শনিবার মারা গেছে জানতে পারলাম। 

হাসপাতাল মালিক মোশারফ হোসেন বলেন, চিকিৎসায় যেকোন সময় রোগী মারা যেতে পারে। ডাক্তার কখনও ইচ্ছা করে রোগীকে ভুল চিকিৎসা করেনা। তিনি ৪ লাখ টাকায় রোগীর পরিবারের সাথে আপোষ করার কথা অস্বীকার করেন। 

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকদ জানান, আমি জেলার মিটিংয়ে ছিলাম। ওই সময় থানায়  কী হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে জানতে পেরেছি, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় এসে হাসপাতাল ও ডাক্তারের  বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই মর্মে একটি লিখিত দিয়ে গেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

ভৈরবে সাবেক মেয়রের জানাজায় জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দেয়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গ্রেপ্তার

ভৈরবে ট্রমা হাসপাতালের  চিকিৎসকের অবহেলায় প্রসূতি নারীর মৃত্যুর অভিযোগ।। নিহতের পরিবারের সাথে  চার  লাখ টাকায় আপোষ।। 

Update Time : ০৫:২০:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

 ৩ জানুয়ারী,  নিজস্ব  প্রতিনিধি। 

 ভৈরবে  বেসরকারি ট্রমা  হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ঝুমা বেগম (২০) নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত ঝুমা বেগম ভৈরব উপজেলার কালিপুর দক্ষিণ পাড়ার কুদ্দুস মিয়ার মেয়ে এবং কালিকাপ্রসাদ এলাকার মো. তৌফিক মিয়ার স্ত্রী। মাত্র দেড় বছর আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এই দম্পতির এটিই ছিল প্রথম সন্তান।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেলে প্রসব বেদনা শুরু হলে ঝুমাকে স্থানীয় ভৈরব ট্রমা এন্ড জেনারেল হাসপাতাল (প্রা:) ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর রোগীকে কোনো প্রকার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রাত ৮টার দিকে তড়িঘড়ি করে অস্ত্রোপচার (সিজার) করেন ডা. হরিপদ দেবনাথ। ঝুমা একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেও অস্ত্রোপচারের কিছুক্ষণ পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।

নিহতের স্বজনরা জানান, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকের ভুলে রোগীর জরায়ু কেটে ফেলায় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রাতভর ৮ ব্যাগ রক্ত দিলেও রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সকালে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে  পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ শনিবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়। 

নিহতের চাচা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা ও চরম অবহেলার কারণেই আমার ভাতিজির মৃত্যু হয়েছে। অবস্থা খারাপ হওয়ার পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শেষ মুহূর্তে ঢাকায় রের্ফাড করেন। তখন আর করার কিছু ছিল না।

নিহতের চাচাতো ভাই রাকিব জানান, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটি একটি অবহেলা। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিলে আজকে এই মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটতো না। ডাক্তারের ভুল চিকিৎসা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ঝুমার  মৃত্যু হয়েছে।

এই দিকে নিহতের স্বজনরা ঢাকা থেকে মরদেহটি নিয়ে বিকাল ৫টায় ভৈরব থানার সামনে উপস্থিত হন। এসময় ২ ঘন্টার বেশি সময় থানার গেইটে সামনে মরদেহটির এম্বোলেন্স দাড়াঁনো থাকে। এক পর্যায়ে থানার গেটে মরদেহ রেখে হাসপাতাল মালিকদের পক্ষে একটি  প্রভাবশালী মহলের মধ্যস্থতায় বিষয়টি ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নিহতের স্বজনদের মধ্যে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রফাদফা হয়। বিষয়টির ব্যাপারে নিহত ঝুমার চাচা রাশেদ জনপদ প্রতিনিধির নিকট স্বীকার করেন ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি আপোষ মীমাংসা হয়েছে ।  যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ  রফাদফার কথা অস্বীকার করেছে। 

এব্যাপারে অ্যানেস্থেসিয়া ডাক্তার মাহবুবুর রহমান রাজীব জানান, রোগীর অপারশনের সময় ভাল ছিল। পরে আমি চলে আসার পর কি হয়েছে তা আমি জানিনা। 

এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. হরিপদ দেবনাথ বলেন, অপারেশন করার পর রোগীর অবস্থা ভাল ছিল। কিন্ত পরবর্তীতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ( ডিআইসি)  শুরু হলে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়। সাধারনত প্রসুতির অপারেশনে এমন হয়না। তবে তার অপারেশনের প্রেসার উঠানামা করেছে। পরে তাকে আমরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠিয়ে দেয়। সেখানে আজ শনিবার মারা গেছে জানতে পারলাম। 

হাসপাতাল মালিক মোশারফ হোসেন বলেন, চিকিৎসায় যেকোন সময় রোগী মারা যেতে পারে। ডাক্তার কখনও ইচ্ছা করে রোগীকে ভুল চিকিৎসা করেনা। তিনি ৪ লাখ টাকায় রোগীর পরিবারের সাথে আপোষ করার কথা অস্বীকার করেন। 

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকদ জানান, আমি জেলার মিটিংয়ে ছিলাম। ওই সময় থানায়  কী হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে জানতে পেরেছি, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় এসে হাসপাতাল ও ডাক্তারের  বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই মর্মে একটি লিখিত দিয়ে গেছে।