২২ নভেম্বর, নিজস্ব প্রতিনিধি
ভৈরব উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের মৌটুপি গ্রামে গত ৫৫ বছরে ১৮ টি খুন, সহস্রাধিক আহত, কয়েকশ বাড়ীঘর বার বার লুটপাট ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং উভয়পক্ষের শতাধিক মামলা হয়েছে। গ্রামের দুই বংশের আধিপত্য বিস্তার ও শত্রুতাকে কেন্দ্র করে বার বার সংঘর্ষ, ঝগড়া লেগেই থাকত। এসব বিরোধের নেপথ্যের নায়ক গ্রামের দুইজন চেয়ারম্যান। একজন হলো বর্তমান সাদেকপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ সাফায়েত উল্লাহ, অপরজন হলো সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মোঃ তোফাজ্জল হক। বর্তমান চেয়ারম্যান সাফায়েত উল্লাহ সরকার বংশের ও সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা কর্তা বংশের নেতৃত্ব দিতেন। উভয় বংশের লোকজন ৭/৮ শ করে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিএনপির নেতৃবৃন্দ দুই পক্ষকে মিলিয়ে দিয়ে গলায় মালা পড়িয়ে দিলেন। এখবরটি শুক্রবার রাতে গণমাধ্যম কর্মীদেরকে জানিয়ে দিলেন স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ। আজ শনিবার সকালে দুই বংশের দুই নেতা মীমাংসার কথাটি স্বীকার করেছেন।
উপজেলার এই মৌটুপি গ্রামটি এলাকায় দাঙ্গাবাজ গ্রাম হিসেবে স্থানীয়দের কা্ছে পরিচিত। গ্রামের মানুষগুলি আইনশৃংখলা বাহিনী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মুরুব্বিদের কারো ডাক দোহাই মানেনা। এমনকি পুলিশ মামলার আসামী ধরতে গেলে আসামী ছিনিয়ে রেখে পুলিশকে আটক করে রাখার ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরে কমপক্ষে শতবার সংঘর্ষ হয়েছে দুই বংশের মধ্য। সর্বশেষ কর্তা বংশের নাদিম ২০২৪ সালে খুন হয়। এরপর সরকার বংশের ইকবাল খুন হয়েছে। ৫৫ বছরে দুই পক্ষের মধ্য খুন হয় ১৮ জন। তার মধ্য বর্তমান চেয়ারম্যানের আপন দুই ভাই কর্তা বংশের লোকজনের হাতে খুন হয়েছে।
এরই মধ্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুই বংশের দুই নেতাসহ হাজারও লোকজন গ্রাম থেকে পালিয়ে যায় মামলার ভয়ে। ২০২৪ সালে দুটি খুনের ঘটনায় উভয় পক্ষের শতাধিক ঘরবাড়ী ভাঙচুর, লুটপাট হয়। একাধিক ঘর ধ্বংস করে দেয়ার ফলে লোকজন অন্য গ্রামে বসবাস করলেও এসব বাড়ীঘর পূনঃনির্মাণ করেনি। এসব ঘটনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলম কয়েকদিন আগে উদ্যেগ গ্রহন করেন দুই বংশের ৫৫ বছরের বিরোধ মীমাংসার। শরীফুল আলম আসন্ন সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৬ ( ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন। তাকে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তারই নির্দেশে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ রফিকুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ আরিফুল ইসলামসহ দলের একাধিক নেতৃবৃন্দ মৌটুপি গ্রামের দুই বংশের দুই নেতার সাথে তাদের বিরোধ মীমাংসার প্রস্তাব করেন। তাদের প্রস্তাবটি দুই পক্ষই সম্মতি দিলে গত সপ্তাহে দুই বংশের লোকজন নিয়ে মৌটুপি গ্রামে বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠকে আলোচনার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয় তারা ভবিষ্যতে আর কখনও ঝগড়া সংঘর্ষে জড়াবেনা। সামান্য বা তুচ্ছ ঘটনায় বিরোধ না করে মিলেমিশে মীমাংসা করবে। এপর্যন্ত দুই পক্ষের যত মামলা মোকাদ্দমা আছে তা আগামী সংসদ নির্বাচনের পর দুই পক্ষ বসে আলোচনার ভিত্তিতে বিএনপির নেতৃবৃন্দ মীমাংসার ব্যবস্থা করে দিবেন। বিষয়টি মীমাংসার পর গতকাল শুক্রবার দুপুরে এলাকার বিএনপির নেতা ভিপি সাইফুল হকের বাড়ীতে দুইপক্ষের খাবারের আয়োজন করা হয়। খাবার আয়োজনে দুই বংশের দুই নেতা সাফায়েত উল্লাহ ও তোফাজ্জল হকসহ উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিক এবং সাধারণ সম্পাদক আরিফুল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও পৌর বিএনপির সভাপতি হাজি শাহিন ও সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান, যুবদল নেতা দেলুয়ার হোসেন সুজনসহ একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে দুই বংশের দুই নেতা গলাগলি, কুলাকুলি করেন মালা পড়ে। অঙ্গীকার করেন আর বিরোধ – শত্রুতা নয়। এখন থেকে মিলেমিশে গ্রামে বসবাস করবেন। এভাবেই ৫৫ বছরের বিরোধ শত্রুতার অবসান করে দেন বিএনপির নেতৃবৃন্দ।
এবিষয়ে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান সাফায়েত উল্লাহ বলেন, আমরা আর ভবিষ্যতে বিরোধে জড়িয়ে ঝগড়া, সংঘর্ষ করবনা। একই কথা বলেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ তোফাজ্জল হক। তারা দুজন জানান, আমরা এখন ভাই ভাই হয়ে গ্রামে বসবাস করব।
এব্যাপারে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের নেতা শরীফুল আলমের নির্দেশে আমরা মৌটুপি গ্রামের ৫৫ বছরের শত্রুতার অবসান করে দিলাম। সাধারণ সম্পাদক মোঃ আরিফুল ইসলাম বলেন, মৌটুপি গ্রামটিতে একটি কুচক্রি মহল যুগ যুগ ধরে দুই পক্ষকে বিবাধে জড়িয়ে রেখে ফায়দা লুটত। মামলা মোকাদ্দমা লাগিয়ে লাগত। আমরা গতকাল শুক্রবার এই দুই বংশের বিরোধ মীমাংসা করে গ্রামে শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছি। ভিপি সাইফুল হক বলেন, মৌটুপি গ্রামেই আমার বাড়ী। অনেকটা চেষ্টার পর দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসা করতে সফল হয়েছি।
Reporter Name 









