কাম করলে পরিবারের  পেটে ভাত জোটে,  না করলে মাথায় হাত। ভৈরবের বেশীর ভাগ  শ্রমিক মে দিবস কি জানেনা।  

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৪৬:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
  • ১৬০ Time View

১ মে , নিজস্ব  প্রতিনিধি

আজ আন্তর্জাতিক মে দিবস। ১ মে।  শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কিন্ত এই  দিবসের গুরুত্ব কি কিছুই জানে না  ভৈরবের শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে বছরের পর বছর কাজ করে গেলেও তারা রয়েছেন অবহেলিত ও ন্যয্য মজুরী থেকে বঞ্চিত।

জানা গেছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত বন্দরনগরী ভৈরব। ফলে এই বন্দরের পুরাতন ফেরিঘাট ও নৌকাঘাটসহ শহরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কল-কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে কয়েক হাজার শ্রমজীবী মানুষজন। এসব খেটে খাওয়া শ্রমজীবি  মানুষজন জানে না তাদের অধিকার বলে কিছু আছে। তারা শুধু জানে কাজ করলে পরিবারের  পেটে ভাত, আর কাজ না করলে মাথায় হাত। 

অথচ প্রতি বছরই আজকের এই দিনে সরকারীভাবেসহ বিভিন্ন সংগঠন শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষকে  নিয়ে সভা, সমাবেশ কিংবা র‍্যালী করা হয়  কিন্তু এতে বাড়েনি তাদের জীবনযাত্রার মান। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তারা রয়েছেন অবহেলিত। 

ভৈরব বাজার নৌকা ঘাটে শ্রমিকের কাজ করেন রমিজ উদ্দিন। তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে কাজ করছেন। মে দিবস কি জিজ্ঞাসা করতেই উত্তর দিতে পারেনি এই শ্রমিক । তার মতে, কাম করলে পেটে ভাত আর না করলে মাথায় হাত। এর বাইরে কিছুই বুঝেন না তিনি। 

ভৈরব মেঘনা ফেরিঘাটের কয়লা   শ্রমিক আবদুর রশিদ বলেন, মে দিবস দিয়ে কি করব। আমরা গরীব মানুষ। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সকাল ৮ টায় কাজে আসি। সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে বাসায় ফিরি। প্রতিদিন কাজ করলে মুজুরি পায় ৫/৬ শ টাকা। এটাকায় বউ পোলাপাইন নিয়ে সংসার চালাই, ভাত খাই। একদিন কাজে না আসলে পেটে ভাত জোটেনা। ৮ ঘন্টা কাজ করার খবর তার জানা নেই। একই কথা বলেন আরেক কয়লা শ্রমিক কালু মিয়া। 

অন্যদিকে একই চিত্র ভৈরবের অন্যতম সেক্টর পাদুকা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদেরও। তারাও জানে না তাদের অধিকারের কথা, ফলে মালিকদের ইচ্ছে মতো কাজ করতে হচ্ছে তাদের। ভৈরবের প্রায় ৫ হাজার  পাদুকা কারখানায় ৫০/৬০ হাজার শ্রমিক দিনরাত কাজ করে। মে দিবসের খবর তাদের জানা নেই। তারা জানে কাজ করলে দৈনিক বেতন মিলে ৪/৫ শ টাকা। ঘন্টার হিসেব নেই তাদের। সকাল- সন্ধ্যা কাজ করলে মালিক বেতন দিবে এটাই তাদের জানা। 

সরকারী  নিয়ম অনুযায়ী কাজের সময়সীমা আট ঘণ্টা নির্ধারণ করা থাকলেও মালিকরা  যে যেভাবে পারছেন কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। আর শ্রমিকরাও বাধ্য হয়ে কখনও ১২ ঘন্টা কখনও ১৬ ঘন্টা  কাজ করে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত ঘন্টার বেতন দেয়া হয়না।  ফলে ন্যয্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

আলমগীর হোসেন নামের  একজন পাদুকা শ্রমিক বলেন, মে দিবস  মানে হলো শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন এবং ন্যয্য মজুরী নিশ্চিত করার দিন। কিন্তু কে শুনে কার কথা। ন্যয্য মজুরি চাইলেই চাকরি নেই, কাজ থাকেনা। সংসার চালাতে কাজ করতেই হয়। 

এদিকে ভৈরবে  পাদুকা শিল্প ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারী সেক্টরে  লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করলেও সরকারি বা বেসরকারি ভাবে কারো কাছেই নেই কোন তালিকা। তাই, শ্রমিকদের জন্য একটি ডাটাবেইজ করা খুবই প্রয়োজন বলে মনে করেন ভৈরব পাদুকা কারখানা মালিক সমিতির সভাপতি মো. আল আমিন মিয়া। 

একই সঙ্গে শ্রমিকদের দুর্দিন-দু:সময়ে পাশে দাঁড়াবে সরকার, এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি। 

শুধু তাই নয়, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এসব শ্রমিকদের কল্যাণে নানা মুখি উদ্যোগ সরকারীভাবে  গ্রহন করলে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। 

এ প্রসঙ্গে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম মামুনুর রশীদ বলেন, মে দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস। অথচ, এ ব্যাপারে শ্রমিকরা সচেতন না। তাই শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনতে হলে এবং তাদের তালিকা তৈরি করতে হলে সবার আগে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে হবে। তাহলেই শ্রমিকদের ন্যয্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

ভৈরবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উদযাপিত।

কাম করলে পরিবারের  পেটে ভাত জোটে,  না করলে মাথায় হাত। ভৈরবের বেশীর ভাগ  শ্রমিক মে দিবস কি জানেনা।  

Update Time : ০২:৪৬:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

১ মে , নিজস্ব  প্রতিনিধি

আজ আন্তর্জাতিক মে দিবস। ১ মে।  শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কিন্ত এই  দিবসের গুরুত্ব কি কিছুই জানে না  ভৈরবের শ্রমজীবী মানুষজন। ফলে বছরের পর বছর কাজ করে গেলেও তারা রয়েছেন অবহেলিত ও ন্যয্য মজুরী থেকে বঞ্চিত।

জানা গেছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত বন্দরনগরী ভৈরব। ফলে এই বন্দরের পুরাতন ফেরিঘাট ও নৌকাঘাটসহ শহরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কল-কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে কয়েক হাজার শ্রমজীবী মানুষজন। এসব খেটে খাওয়া শ্রমজীবি  মানুষজন জানে না তাদের অধিকার বলে কিছু আছে। তারা শুধু জানে কাজ করলে পরিবারের  পেটে ভাত, আর কাজ না করলে মাথায় হাত। 

অথচ প্রতি বছরই আজকের এই দিনে সরকারীভাবেসহ বিভিন্ন সংগঠন শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষকে  নিয়ে সভা, সমাবেশ কিংবা র‍্যালী করা হয়  কিন্তু এতে বাড়েনি তাদের জীবনযাত্রার মান। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তারা রয়েছেন অবহেলিত। 

ভৈরব বাজার নৌকা ঘাটে শ্রমিকের কাজ করেন রমিজ উদ্দিন। তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে কাজ করছেন। মে দিবস কি জিজ্ঞাসা করতেই উত্তর দিতে পারেনি এই শ্রমিক । তার মতে, কাম করলে পেটে ভাত আর না করলে মাথায় হাত। এর বাইরে কিছুই বুঝেন না তিনি। 

ভৈরব মেঘনা ফেরিঘাটের কয়লা   শ্রমিক আবদুর রশিদ বলেন, মে দিবস দিয়ে কি করব। আমরা গরীব মানুষ। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সকাল ৮ টায় কাজে আসি। সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে বাসায় ফিরি। প্রতিদিন কাজ করলে মুজুরি পায় ৫/৬ শ টাকা। এটাকায় বউ পোলাপাইন নিয়ে সংসার চালাই, ভাত খাই। একদিন কাজে না আসলে পেটে ভাত জোটেনা। ৮ ঘন্টা কাজ করার খবর তার জানা নেই। একই কথা বলেন আরেক কয়লা শ্রমিক কালু মিয়া। 

অন্যদিকে একই চিত্র ভৈরবের অন্যতম সেক্টর পাদুকা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদেরও। তারাও জানে না তাদের অধিকারের কথা, ফলে মালিকদের ইচ্ছে মতো কাজ করতে হচ্ছে তাদের। ভৈরবের প্রায় ৫ হাজার  পাদুকা কারখানায় ৫০/৬০ হাজার শ্রমিক দিনরাত কাজ করে। মে দিবসের খবর তাদের জানা নেই। তারা জানে কাজ করলে দৈনিক বেতন মিলে ৪/৫ শ টাকা। ঘন্টার হিসেব নেই তাদের। সকাল- সন্ধ্যা কাজ করলে মালিক বেতন দিবে এটাই তাদের জানা। 

সরকারী  নিয়ম অনুযায়ী কাজের সময়সীমা আট ঘণ্টা নির্ধারণ করা থাকলেও মালিকরা  যে যেভাবে পারছেন কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। আর শ্রমিকরাও বাধ্য হয়ে কখনও ১২ ঘন্টা কখনও ১৬ ঘন্টা  কাজ করে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত ঘন্টার বেতন দেয়া হয়না।  ফলে ন্যয্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

আলমগীর হোসেন নামের  একজন পাদুকা শ্রমিক বলেন, মে দিবস  মানে হলো শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন এবং ন্যয্য মজুরী নিশ্চিত করার দিন। কিন্তু কে শুনে কার কথা। ন্যয্য মজুরি চাইলেই চাকরি নেই, কাজ থাকেনা। সংসার চালাতে কাজ করতেই হয়। 

এদিকে ভৈরবে  পাদুকা শিল্প ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারী সেক্টরে  লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করলেও সরকারি বা বেসরকারি ভাবে কারো কাছেই নেই কোন তালিকা। তাই, শ্রমিকদের জন্য একটি ডাটাবেইজ করা খুবই প্রয়োজন বলে মনে করেন ভৈরব পাদুকা কারখানা মালিক সমিতির সভাপতি মো. আল আমিন মিয়া। 

একই সঙ্গে শ্রমিকদের দুর্দিন-দু:সময়ে পাশে দাঁড়াবে সরকার, এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি। 

শুধু তাই নয়, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এসব শ্রমিকদের কল্যাণে নানা মুখি উদ্যোগ সরকারীভাবে  গ্রহন করলে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। 

এ প্রসঙ্গে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম মামুনুর রশীদ বলেন, মে দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস। অথচ, এ ব্যাপারে শ্রমিকরা সচেতন না। তাই শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনতে হলে এবং তাদের তালিকা তৈরি করতে হলে সবার আগে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে হবে। তাহলেই শ্রমিকদের ন্যয্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।